meghna
sad-bin-kader

২০১৯ সালের এপ্রিল মাস। হঠাৎ করে জানতে পারি ডিপার্টমেন্টের ছোট বোন বিনিতা রাণী রায় দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। দিনদিন তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা দরকার।

meghna

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার নিম্নবিত্ত পরিবারের পক্ষে চিকিৎসার খরচ বহন করা খুব কঠিন হয়ে পড়ছিল। একপর্যায়ে গিয়ে তার পরিবার একরকম নিঃস্ব হয়ে পড়ে। তবুও বিনিতা বাঁচতে চায়। সে সমাজের সকলের কাছে বাঁচার আকুতি জানায়। আমরা নিজেদের জায়গা থেকে সাধ্যমত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিই। কিন্তু অল্পজনের দশ পাঁচ টাকা দিয়ে খুব একটা বড় ফান্ড জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছিল না। বিনিতার বন্ধুরা ছিল নাছোড়বান্দা। তাদের কথা একটাই যেভাবে হোক বিনিতাকে বাঁচাতে হবে। ঠিক সে সময়টায় দেবদূতের মতো দৃশ্যপটে হাজির হোন ছাত্রনেতা সাদ বিন কাদের চৌধুরী।

সাদ বিন কাদেরের সাথে আমার তেমন পরিচয় ছিল না, ফলে উনার সম্পর্কে আমার জানাশোনা ছিল না বললেই চলে। ছাত্রনেতা পরিচয় পেয়ে ভাবছিলাম উনিও হয়ত অন্যান্যদের মতোই হবেন। কিন্তু না, তিনি আমাকে ভুল প্রমাণ করে কালক্ষেপণ না করে বিনা স্বার্থে মানবতার কল্যাণে সাড়া দিয়ে বিনিতার জন্য ফান্ড সংগ্রহে নেমে পড়েন।

বিনিতার বন্ধুদের সাথে নিয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অলিগলি ঘুরে ঘুরে মাত্র ৩/৪ দিনের মধ্যে লক্ষাধিক টাকা সংগ্রহ করেন। শুধু টাকা সংগ্রহ করেই ক্ষ্যান্ত হননি তিনি, বিনিতার সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে দেশের ডাক্তারদের পরামর্শে তাকে ভারতে পাঠানোর বন্দোবস্ত করতেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সবকিছু ঠিকঠাক। কয়েকদিনের মধ্যেই চিকিৎসার জন্য বিনিতাকে ভারতে পাঠানো হবে। সবকিছু নিজ হাতে দেখভাল করতে তিনি ঢাকা থেকে ছুটে যান বিনিতার পঞ্চগড়ের বাড়ীতে।

যদিও তিনি পৌঁছানোর দুই আড়াই ঘণ্টা আগেই বিনিতা না ফেরার দেশে চলে যান। মৃত্যু সংবাদ শুনে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল তিনি তার রক্তের আপনজন কাউকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছেন। পরে নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি বিনিতার পরিবারকে সমবেদনা জানান এবং তাদের পাশে দাঁড়ান। তিনি যে শুধু বিনিতা রাণীর জন্য এতো কিছু করেছেন তা কিন্তু নয়, তিনি বিনিতার মতো একাধিক মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন কেবল নিজের দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে। বর্তমান ছাত্রনেতার মধ্যে এমন বৈশিষ্ট্য খুব কমজনের মধ্যেই দেখা যায়।

সাদ বিন কাদের চৌধুরী যে কতটা মানবহিতৈষী ছাত্রনেতা তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে করোনাকালীন মহা দুর্যোগের সময়। মরণঘাতী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সবাই যখন ঘরবন্দী ছিল, একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কেউ যখন বাসা থেকে বের হতো না, ঠিক সে সময়টায় তিনি নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। সে সময়টায় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এমনো খবর বের হয়েছিল করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে মারা যাওয়া ব্যক্তিকে তার স্ত্রী সন্তানেরা গ্রহণে আগ্রহী নয়, এমনকি করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে অংশ নিত না লাশের সৎকারেও। ঠিক সেই সময়টায় সাদ বিন কাদের চৌধুরী দেশমাতৃকার জন্য জাতীয় স্বার্থে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন।

সেই কঠিন সময়ে করোনায় আক্রান্ত হয়ে কিংবা অন্য কোনো কারণে যারাই শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন তাদের কাছে বিনামূল্যে পৌঁছিয়ে দিতেন জয় বাংলা অক্সিজেন সেবা। তিনি এভাবে কতজনকে সাহায্য করেছেন তা নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। তবে সংখ্যাটা যে ১০ হাজারেরও অনেক বেশি হবে তা কোনো প্রকার যোগ বিয়োগ করা ছাড়াই বলা যায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গণমাধ্যম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট অধিবেশন ও জাতীয় সংসদ অধিবেশনে জয় বাংলা অক্সিজেন সেবার প্রশংসা করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট অধিবেশনেও এ উদ্যোগের জন্য ধন্যবাদ প্রস্তাব পাস করেন সিনেট সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। জাতীয় সংসদ অধিবেশন ও বিভিন্ন আলোচনায় স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

বর্তমান ছাত্ররাজনীতি একটা খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। পত্র-পত্রিকার পাতা কিংবা টিভি চ্যানেল খুললেই বর্তমানে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে তেমন ভালো খবর শোনা যায় না। বেশিরভাগ সংবাদ শুনলে মনে হয় একসময় যে ছাত্ররাজনীতি দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করতো, সেই ছাত্ররাজনীতি এখন আর নেই। প্রায় সবাই রাজনীতিকে ব্যবহার করে নিজের স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত। ব্যতিক্রম যে একেবারে নেই তা কিন্তু নয়। সাদ বিন কাদের চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ছাত্রনেতাদের জন্যই এখনো দেশ টিকে আছে বলে মনে করি। তবে তারা সংখ্যায় খুবই কম।

 

এম/এস

meghna

আরও পড়ুন


meghna