meghna
images-4 নিগার সুলতানা রুনি

সময়টা ছিল আশির দশক। যখন ছেলে-বুড়ো শিশু-নারী দর্শকরা টিভি সেটের সামনে অপেক্ষা করতেন নাটক দেখার জন্য। বিটিভিতে প্রচারিত নাটকই ছিল একমাত্র অবলম্বন। বিনোদনের পাশাপাশি শিক্ষণীয় বিষয় ছিল নাটকের উপজীব্য। আনন্দ আর শিক্ষার সমন্বয়ে দর্শক নব চেতনায় বারবার জেগে উঠত। অনেকে ছিলেন যারা ভাষাকে শুদ্ধ করে বলার জন্যই নাটক দেখতেন। তখন যারা সুন্দর করে কথা বলতেন তারা প্রায় সবাই বলতেন, “আমি বিটিভির নাটক দেখি”। অর্থাৎ ভাষার শুদ্ধ ব্যবহারের একটি মাধ্যম ছিল নাটক। সেই সোনালী সময়টা আমরা হারিয়ে ফেলেছি।

meghna

বর্তমানে টিভি চ্যানেলের সংখ্যা বেড়েছে। রিমোটে মুহুর্তেই ঘুরে আসা যায় এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে। অথচ দর্শক চাহিদার কিয়দংশও কি পূরণ হচ্ছে? দর্শকের মনে জন্ম নিচ্ছে হতাশা। বাড়ছে ক্লান্তি। নাটকের মান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন নাট্যকার নির্মাতারা। ডিজিডাল যুগে সুযোগ সুবিধা বাড়লেও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে না নাটকগুলো। ফলে বৈদেশিক ড্রামা সিরিয়ালগুলোর কদর বাড়ছে।

নাটকে ভাষার প্রশ্নে নিথর ও নিস্তব্ধ হয়ে যেতে হয়। আঞ্চলিক ভাষার প্রাধান্য সত্যিই বাড়াবাড়ি। গ্রামীন বাংলার সেই চিরচেনা সহজ সরল মানুষগুলো বদলে এখন জায়গা করে নিয়েছে এক একটি ভাড়ামী চরিত্র। এর ফলে গ্রামীণ বাংলার রূপ বদলে দিচ্ছে। জোর করে লোক হাসানো গেলেও মিলছে না সন্তুষ্টি। বড় দুঃখের বিষয়,এই প্রজন্ম একদিন বদ্ধমূলভাবেই মনে করবে, গ্রামীণ মানুষগুলো সত্যিই ভাড়ামীপূর্ণ। গ্রামীণ মানুষকে নতুন প্রজন্ম হেয় চোখে দেখবে। কারণ তাদের হয়ত গ্রামে যাওয়ার কিংবা মানুষের সাথে মেশার সুযোগ কম। অনেকের জন্য মিডিয়াই ভরসা। সেখানে তারা দেখবে এই মানুষগুলো কত কৌতুকপূর্ণ! শুধু তাই নয় ,বহির্বিশ্বের কাছেও একইভাবে উপস্থাপন হচ্ছে গ্রামীণজীবন। এক সময় এই চরিত্রগুলোই স্থায়ী হবে, কারণ এর বাইরে অন্য কিছু দেখা যাচ্ছে না বর্তমান নাটক জগতে। হয়ত দুই একটা ব্যতিক্রম। এই সীমিত ব্যাতিক্রম দিয়ে কি আমাদের ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা যাবে সেই প্রশ্নই এখন একটা বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভুলে গেলে চলবে না, বাংলা ভাষা শুদ্ধভাবে বলতে পারা ও শুদ্ধ উচ্চারণ শেখার ক্ষেত্রে নাটক এক অনন্য ভুমিকা রেখেছে। নব্বইয়ের দশকে আমাদের জনপ্রিয় নাটকগুলোতে শুদ্ধ বাংলা ভাষার প্রতি নির্মাতাদের গুরুত্ব ছিল বেশি। শহর বন্দর গ্রামসহ সব শ্রেণির দর্শকের কাছে এসব নাটক সমাদৃত হয়। কিন্তু আজকাল ক্রমেই নাটক থেকে হারিয়ে যাচ্ছে শুদ্ধ বাংলা ভাষা। এখন নাটকে চলিত ও আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহারই চোখে পড়ে বেশি। নতুন প্রজন্মের বড় একটি অংশ শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণে কথা বলতে পারেন না।

সব নাটক প্রমিত বাংলায় হতে হবে এমন কোন নিয়ম নেই। যদি আঞ্চলিক কোনো নাটক হয় সেটা ভিন্ন কথা। বিনা কারণে টিভি নাটকে বাংলা ভাষার উচ্চারণে অশুদ্ধতা, অসংলগ্ণতা সমর্থন যোগ্য নয়। চরিত্রের প্রয়োজনে নাটকে আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার হবে, কিন্তু সেটা যেন ভাড়ামো না হয়। কারণ প্রমিত ভাষার মতো আঞ্চলিক ভাষারও একটা সৌন্দর্য আছে।

নাট্য ব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ তার একটি লেখায় বলেছেন, নাটক যেহেতু জীবনকে বৃহত্তর অর্থে ধারণ করে, তাই এই শিল্পের জন্য একটি বৈশিষ্ট্যময় ভাষা নির্মাণ প্রয়োজন। এই ভাষায় কখনো প্রমিত, কখনো আঞ্চলিক আবার দুইয়ের মিশ্রণে এক নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ ঘটে থাকে। এখানেই নাট্যকারের বড় ধরনের কৌশল কাজ করে। নাটকের চরিত্রগুলো হয় ভিন্ন ভিন্ন যেমন তাদের জীবনবোধ, তেমনি আচার আাচরণও বহুমাত্রিক। স্থান, কাল ও পাত্র বিবেচনায় একই গ্রন্থিতে নাটকটিকে সাজাতে গিয়ে নাট্যভাষার প্রয়োজন হয়। নাটক যেহেতু জীবনের সাথে মিশে, তাই সংলাপ নির্মাণের ক্ষেত্রে ভাষা আমাদের যে সুযোগ করে দিয়েছে তার যথার্থ প্রয়োগ প্রয়োজন।

ওপার বাংলার টিভি সিরিয়ালগুলোতে দেখা যায় শুদ্ধ বাংলা ভাষার ব্যবহার। আমাদের দেশের দর্শরাও সেসব নাটক দেখছেন নিয়মিত দেশীয় সিরিয়াল উপেক্ষা করে।শু।

বর্তমানে নাটকের ক্ষেত্রে আমরা কয়েকটি নির্দিষ্ট আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে আটকে আছি। নাটক দেখলে মনে হয় এগুলোই আমাদের সংস্কৃতি। যে ভাষার ব্যবহারের জন্য রক্ত ঝরাতে হয়েছে সেই শুদ্ধ বাংলা ভাষা আজ অন্কেটাই দায়সারাভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে সর্বত্র। বিশেষ করে টিভি মাধ্যমে। এফএম রেডিওগুলোতে একই অবস্থা দেখা যায়, যা দুঃখজনক এবং হতাশাব্যাঞ্জক।

দায়িত্ববোধের জায়গাটি যদি সবার থাকে তাহলে এমন অব্যবস্থাপনা হওয়ার কথা নয়। একা কিন্তু কেউ সুন্দর থাকতে পারে না। কাজের জায়গাটি যদি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে এককভাবে কেউ ভালো থাকতে পারবেন না। নাট্যাঙ্গনে যারা জড়িত আছেন তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে পারে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা অটুট রাখব এই হোক আমাদের অঙ্গিকার।
 

meghna

আরও পড়ুন


meghna