meghna
452771

অটিজম শব্দটির সঙ্গে বর্তমানে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। সামাজিক যোগযোগের সীমাবদ্ধ দক্ষতার এই সমস্যাটির ফলে ভাষার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এতে শিশুটিকে জীবনব্যাপী সমাজে বসবাস করেও সামাজিক জীব নামক বিশেষণ থেকে দূরে অবস্থান করতে হয়। যদিও সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৯ (১) ও (৩), ২৭, ২৮, (১), (২) ও (৪) এবং ২৯ (১) অনুযায়ী অবহেলিত, পশ্চাৎপদ, দরিদ্র, এতিম, প্রতিবন্ধী এবং অনগ্রসর মানুষের কল্যাণ ও উন্নয়ন নিশ্চিতকরণের জন্য সরকার কর্তৃক গৃহীত হয়েছে স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যা এনডিডি ব্যক্তিসহ সব ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন, ২০১৩, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ এবং প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কিত সমন্বিত বিশেষ শিক্ষা নীতিমালা, ২০১৯।

meghna

অটিজম কোনো প্রতিবন্ধিতা নয়, এটি একটি বর্ধনমূলক বৈকল্য, যা শুধু শিশুদেরই হয়ে থাকে। স্নায়ুর বিকাশজনিত এই বৈকল্য কেন হয়, এই প্রশ্নের কোনো সর্বজনস্বীকৃত উত্তর গবেষকরা এখনো খুঁজে পাননি। অটিজম সমস্যাটি মস্তিষ্কজাত, যা একটি শিশু জন্মের সময়ই বহন করে নিয়ে আসে, যেটি তার শৈশবকালীন বিকাশকে নানাদিক থেকে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করে। তবে বেশি বয়সে সন্তান ধারণ, প্রবল চাপমূলক জীবন, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি কতিপয় পারিপার্শ্বিক পরিবেশমূলক উপাদানকে এ সমস্যাটির উদ্ভবের জন্য দায়ী করা হয়।

অটিজমে কার্যকরী যোগাযোগের দক্ষতার অভাব, সামাজিক মিথস্ক্রিয়তার সমস্যা এবং পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ প্রক্রিয়া এই বিষয় তিনটিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। সাধারণত জন্মের তিন বছরের মধ্যেই অটিজম শনাক্ত করা যায়। সাধারণ শিশুদের যেখানে জন্মের ছয় মাসের মধ্যেই দৃষ্টি সংযোগ বা চোখে চোখ রাখা, বিভিন্ন অস্ফুট শব্দের মাধ্যমে মৈখিক যোগাযোগের ভাষার দক্ষতা তৈরি হতে থাকে, সেখানে অটিস্টিক শিশুরা ক্রমশ এই জগত্ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকে, যা তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে ভাবনার অতল গহ্বরে নিয়ে যেতে বাধ্য করে। কারো কারো ক্ষেত্রে ভাষার বিকাশ প্রথমদিকে স্বাভাবিকভাবে হলেও একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর তা ক্রমশ কমতে থাকে, যা এক সময় একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। অটিজম সমস্যার পরিব্যাপ্তি জীবনব্যাপী।

প্রকৃতপক্ষে, অটিজম সমস্যাটি মস্তিষ্কের কোনো বিচু্যতির একক ফল কিনা তা নির্ণয় করে উঠা এখনো সম্ভব হয়নি (সূত্র :অটিজমের নীল জগত, মুহাম্মদ নাজমুল হক ও মুহাম্মদ মাহবুব মোর্শেদ)। অটিজম বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারকে তাই সংক্ষেপে (এএসডি) বলা হয়। যেখানে ‘স্পেকট্রাম’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ বর্ণালি বা বর্ণের সমষ্টি। এ কারণেই অটিজমকে বেদনার নীল রঙের সঙ্গে তুলনা করা যায়। (সূত্র :আমাদের অটিস্টিক শিশু ও তাদের ভাষা, হাকিম আরিফ ও সালমা নাসরীন) অটিস্টিক শিশুদের আচরণগত বৈচিত্রে্যর কারণে কোনো একক চিকিৎসা পদ্ধতি দিয়ে এ সমস্যার সমাধান হয় না। আবার একই চিকিৎসাপদ্ধতি সব ধরনের অটিস্টিক শিশুর জন্য কার্যকরও নয়।

অটিজম সমস্যাটির শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশও আজ এই সমস্যা মোকাবিলা করছে। এক্ষেত্রে শিক্ষিত শহুরে সমাজ যতখানি সজাগ ও সচেতন, গ্রামীণ সমাজ কিন্তু তা নয়। গ্রামে এখনো অটিজমকে বা অটিস্টিক শিশুকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়া হয় না; বরং পাগল উপাধিতে ভূষিত করা হয়, যা দুঃখজনক। এছাড়া অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে নানারকম কুসংষ্কার প্রচলিত আছে, যার মধ্যে রয়েছে জিন বা ভূতে ধরার মতো আজগুবি গল্প। পত্রিকার পাতাতেও মধ্যে মধ্যে এমন শিশুদের শিকল দিয়ে দীর্ঘদিন বেঁধে রাখার খবর পাওয়া যায়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিশুটির অটিজম শনাক্ত করার কোনো চেষ্টা করা হয় না। উপরন্তু পরিবার থেকে অটিজম আক্রান্ত শিশুদেরকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। যদিও বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বাংলাদেশে অটিজম বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্তসহ গবেষণার উপস্হিতিও কম। যে কারণে কোনো আইন, নীতি ইত্যাদি প্রণয়নের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলেই সমস্যাটির গভীরতা বোঝানো বা উপলব্ধি করানো কষ্টকর হয়ে যায়। যদিও অটিস্টিক শিশুরা বহুমুখী প্রতিভা ও সফলতার স্বাক্ষর রেখে দেশকে তাদের জন্য নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অটিজম সোসাইটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বে জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অটিজম আক্রান্ত, যেখানে ছেলে ও মেয়ে শিশুদের অনুপাত ৪:১। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে দেশে ২ দশমিক ৮৭ শতাংশ ব্যক্তি অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। এ হিসেবে দেড় লাখ ব্যক্তি অটিজম আক্রান্ত যেখানে প্রতি বছর নতুন করে ১ হাজার ৫০০ শিশু যোগ হয়, যা দৈনিক গড়ে চার জনেরও বেশি। এক গবেষণায় দেখা যায়, গ্রামের তুলনায় শহরে অটিজম আক্রান্তের হার বেশি, অর্থাৎ গ্রামে প্রতি হাজারে যেখানে ১ দশমিক ৮ জন শিশু অটিজম আক্রান্ত, সেখানে শহরে এ হার প্রতি হাজারে ২.৫ জন । দেশে ১৬ থেকে ৩০ মাস বয়েসি শিশুদের অটিজম আক্রান্তের হার ১ দশমিক ৭ শতাংশ (সূত্র : দৈনিক যুগান্তর, ২ এপ্রিল, ২০২১)। তবে দেশ-কাল-স্থান পাত্রভেদে বিশ্বের সব দেশেই এই সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। স্পিচ এইড বাংলাদেশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি হাজারে আট জন বা ১২৫ জনে একজন অটিজমে আক্রান্ত এবং প্রতি বছর ১০ থেকে ১৭ শতাংশ হারে অটিজমের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা খুবই উদ্বেগজনক।

এক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অটিজম পরিস্হিতির উন্নয়নের চিত্র এখনো হাঁটি হাঁটি পা পা পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ ২০১৫ সাল থেকে অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতি বছর ২ এপ্রিল বিশ্ব অটিজম দিবস পালন করে আসছে। এছাড়া এ বিষয়ে হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও অটিজমকে জয় করতে আন্তর্জাতিক মানের পর্যায়ে কাজ করছে। তবে এই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের উপযোগী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যথেষ্ট ব্যয়বহুল, যা প্রান্তিক পর্যায়ের একজন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জনবলকে এবং স্থানীয় সম্পদকে যথাযথ ব্যবহার ও প্রশিক্ষণ দিয়ে অটিস্টিক শিশুদের সবার সঙ্গে শিক্ষা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করলে অটিস্টিক শিশুরাও একদিন সামাজিক যোগাযোগের সীমাবদ্ধতার দেওয়াল টপকাতে পারবে। এজন্য এ বিষয়ে গবেষণা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সমন্বিত সহযোগিতা থাকলে রাতারাতি সমাধান না হলেও এই সমস্যার ইতিবাচক প্রভাব আনা সম্ভব।

লেখক: পিএইচডি গবেষক, যোগাযোগবৈকল্য
বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

meghna

আরও পড়ুন


meghna