meghna
women

আত্মহত্যা বাংলাদেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে । সম্প্রতি ফেসবুক লাইভে এসে আত্মহত্যা করা আবু মহসিন খানের ফেসবুক ভিডিও এবং ওই ঘটনার স্থিরচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে গভীর চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

meghna

তার সুইসাইড নোট এবং ভিডিও থেকে জীবনে একাকিত্ব, হতাশা ও বিষণ্ণতাবোধকে দায়ী করা যায়। এ সব অস্বাভাবিক মৃত্যুর একটি সাধারণ কারণ হলো দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সমস্যা। বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর আত্মহত্যার কারণে মৃতের সংখ্যার ২.০৬% হলো বাংলাদেশি।  উন্নত বিশ্বে যেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মানসিক স্বাস্থ্য ব্যাধিকে দেখা হয় সেখানে বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা চরমভাবে উপেক্ষিত।

এমন অভিজ্ঞতা কারও জীবনে না আসুক: ‘সবকিছু ভেঙে পড়ে’ ভয়ংকর অমানবিকতায় (সাইফুল আলম, যুগান্তর, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২) হৃদয় ছোঁয়া ভাষায় লিখেছেন- "আবু মহসিন খানের আত্মহত্যার ঘটনা পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের জন্য এক ভয়াবহ বার্তা দিয়ে গেল। স্মরণের বন্ধন ছিন্ন করে বিস্মৃতির অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়ার জন্য এ জীবন ‘ত্যাগ’ নয়- এ যে কঠিন ‘ত্যাগ’। সমাজকে নাড়া দেওয়ার জন্য, মানবিক মূল্যবোধের গহীনে শেকড় ধরে টান দেওয়ার জন্য এক ব্যক্তির নিঃসংকোচ দুঃসাহস। বিষয়টি বেদনার, দুঃখের, কষ্টের- এতে কোনো সন্দেহ নেই। জীবনের এমন অভিজ্ঞতা আর কারও জীবনে না আসুক- এটাই প্রার্থনা। তবু এ সত্য আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। জীবনকে বোঝার জন্য-‘মৃত্যুর দামে’ ‘জীবনকে কেনা’র জন্য।"

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার সময়, বাংলাদেশ উত্তরাধিকারসূত্রে শুধুমাত্র একটি বিশেষায়িত মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতাল এবং শতাব্দী পুরোনো আইন, লুনাসি অ্যাক্ট ১৯১২ কে পেয়েছিল। অতঃপর জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি ২০১১ প্রণীত হয়েছিল, যেখানে স্বাস্থ্যকে  সম্পূর্ণ শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক সুস্থতা হিসাবে স্বীকৃত দেয়া হয়েছিল। দেশে দ্রুত নগরায়নের ফলে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বেড়ে যাচ্ছে  এ প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে  মানসিক স্বাস্থ্য আইন ২০১৮ (এমএইচএ ২০১৮) প্রণীত হয়েছে।  যেখানে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান সম্পত্তি ও পুনর্বাসনের অধিকার রক্ষা এবং মানসিক ব্যাধি বা অসুস্থতাযুক্ত ব্যক্তিদের সামগ্রিক কল্যাণের বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে । যদিও তা যুগপোযুগী নয় ভবিষ্যতের নীতি সংস্কারের  বিবেচনায়  সীমাবদ্ধতাগুলোকে চিহ্নিত করেতে অন্যান্য কিছু দেশের আইন ও অভিজ্ঞতার বিনিময় করা যায়।
 
মানসিক স্বাস্থ্য আইন ২০১৮ একটি বিশেষ আইন যা অন্যান্য বিদ্যমান আইনের ওপর প্রভাব ফেলে, এতে চারটি প্রধান বিষয়ের বিধান রয়েছে- (ক) মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতাল এবং পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন এবং তত্ত্বাবধান; (খ) মানসিক স্বাস্থ্য রোগীদের মূল্যায়ন, ভর্তি ও চিকিৎসা; (গ) মানসিক স্বাস্থ্যের বিচার বিভাগীয় পরীক্ষা এবং মানসিক ক্ষমতা নির্ধারণ; এবং (ঘ) এ ধরনের রোগীদের ব্যক্তি এবং সম্পত্তির অভিভাবকত্ব। মানসিক স্বাস্থ্য আইন ২০১৮ কিছু প্রাসঙ্গিক পদকে সংজ্ঞায়িত করে, যেমন চিকিৎসার সম্মতি, মানসিক স্বাস্থ্য, মানসিক ব্যাধি এবং মানসিক অসুস্থতা। 'চিকিৎসার জন্য সম্মতি' শব্দটি আলগাভাবে আইনে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং মানসিক অসুস্থতা এবং মানসিক ব্যাধির মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য তৈরি করা হয়েছে। মানসিক অক্ষমতা, মাদকাসক্তি এবং অন্য কোনো চিকিৎসা গত ভাবে স্বীকৃত মানসিক অবস্থা সহ 'মানসিক ব্যাধিকে সংজ্ঞায়িত করা হয়, যা একজন ব্যক্তির শরীর ও মনের সাথে যুক্ত থাকার কারণে তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে, যেখানে মানসিক অসুস্থতাকে সংজ্ঞায়িত করা হয় মানসিক অক্ষমতা বা মাদকাসক্তি ছাড়া অন্য মানসিক অসুস্থতার রূপ হিসেবে। এ আইনে মানসিক ব্যাধি যুক্ত ব্যক্তিদের মূল্যায়ন, ভর্তি এবং চিকিৎসার জন্য আরও বিশদ প্রক্রিয়া এবং পদ্ধতি বর্ণনা করে।
 
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক একটি সমীক্ষায় দেখা যায় প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার ৬.৫-৩১.০% এবং ১৩.৪-২২.৯% শিশুদের মধ্যে মানসিক ব্যাধির লক্ষণ যদিও বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানে স্বাস্থ্যের মানবাধিকার ও জনস্বাস্থ্যের অধিকারকে বিশেষভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।  তবে এটি সাধারণত গ্রহণ করা হয় যে চলমান সামগ্রিক উন্নয়ন উদ্যোগের প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য খাতে অগ্রাধিকার কম বা প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। এখানে কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয় আলোচনা করা দরকার।
 
বিষণ্ণতা মানসিক স্বাস্থ্য ব্যাধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, বিশেষজ্ঞরা একে নানাভাবে তুলে ধরেছেন- "বিষণ্ণতা বলতে ইতিবাচক প্রভাবের অনুপস্থিতি (সাধারণ জিনিস এবং অভিজ্ঞতার প্রতি আগ্রহ এবং উপভোগের হ্রাস), নিম্ন মেজাজ এবং সংশ্লিষ্ট মানসিক, জ্ঞানীয়, শারীরিক এবং আচরণগত লক্ষণগুলির একটি পরিসরের দ্বারা চিহ্নিত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর একটি বিস্তৃত পরিসরে বোঝায়। বিষন্নতার ক্লিনিক্যালি উল্লেখযোগ্য ডিগ্রী (উদাহরণস্বরূপ, প্রধান বিষণ্নতা) এবং 'সাধারণভাবে' ঘটতে থাকা মেজাজের পরিবর্তনগুলোকে পার্থক্য করা সমস্যাযুক্ত থেকে যায় এবং বিষণ্ণতার লক্ষণগুলো তীব্রতার ধারাবাহিকতায় ঘটে বলে বিবেচনা করা ভালো" (লেউইনসন এট আল, ২০০০)।

সাধারণত, মেজাজ এবং একটি বড় হতাশাজনক অসুস্থতার ক্ষেত্রে প্রভাব প্রতিটি দিনের পুরো সময় জুড়ে কম থাকা পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়াশীল নয়, যদিও কিছু লোকের মেজাজ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়, সারা দিন ধীরে ধীরে উন্নতির সাথে শুধুমাত্র ঘুম থেকে উঠার পর মেজাজ ফিরে আসে। অন্যান্য ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির মেজাজ ইতিবাচক অভিজ্ঞতা এবং ঘটনাগুলির প্রতি প্রতিক্রিয়াশীল হতে পারে, যদিও মেজাজের এই উচ্চতাগুলো হতাশাজনক অনুভূতিগুলোর সাথে স্থায়ী হয় না প্রায় দ্রুত তা পুনরুত্থান হয় (আন্দ্রেউস অ্যান্ড জেনকিন্স ১৯৯৯)।

আচরণগত এবং শারীরিক লক্ষণগুলির মধ্যে সাধারণত অশ্রুপাত, বিরক্তি, সামাজিক প্রত্যাহার, পূর্ব-বিদ্যমান ব্যথার বৃদ্ধি এবং পেশীতে টান বৃদ্ধির জন্য গৌণ ব্যথা অন্তর্ভুক্ত থাকে (Gerber  et al., ১৯৯২)। কাম শক্তির অভাব, ক্লান্তি এবং ক্রিয়াকলাপ হ্রাস করা সাধারণ, যদিও আন্দোলন এবং চিহ্নিত উদ্বেগ প্রায়শই ঘটতে পারে। সাধারণত ঘুম কম হয় এবং ক্ষুধা কমে যায় (কখনও কখনও উল্লেখযোগ্য ওজন হ্রাস পায়), কিন্তু কিছু লোক স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঘুমায় এবং ক্ষুধা বৃদ্ধি পায়। দৈনন্দিন জীবনে আগ্রহ এবং উপভোগের হারানো, এবং অপরাধ বোধ, মূল্যহীন এবং প্রাপ্য শাস্তির অনুভূতি সাধারণ, যেমন আত্মসম্মান হ্রাস, আত্মবিশ্বাসের ক্ষতি, অসহায়ত্বের অনুভূতি, আত্মঘাতী ধারণা এবং আত্ম-ক্ষতি বা আত্মহত্যার প্রচেষ্টা। জ্ঞানীয় পরিবর্তনগুলো দরিদ্র ঘনত্ব এবং মনোযোগ হ্রাস।"

বাংলাদেশে মানসিক এবং আচরণগত স্বাস্থ্য সম্পর্কে চর্চা খুবই সীমিত।  অনেক মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা- যেমন বিষণ্ণতা বা প্যানিক ডিসঅর্ডার দ্বারা যখন প্রভাবিত হয় তখন উপযুক্ত কাউন্সিলিং এর অভাবে নানা দুর্ঘটনা ঘটে। এ সমস্যাগুলি পরিষ্কারভাবে চিন্তা করা,যে আপনি কেমন অনুভব করছেন তা ব্যক্ত না করতে পারায় অন্য লোকেদের সাথে কাজ করা ও কঠিন করে তুলতে পারে। কখনও কখনও আপনি অসহায় এবং আশাহীন বোধ করতে পারেন কিন্তু আপনি একা নন. যারা এই সমস্যায় ভুগছেন তাদের সাথে কথা বলা ও সাহায্য করতে পারে এবং চিকিৎসা আপনাকে নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসতে সাহায্য করতে পারে।
বাংলাদেশ সরকারের উচিত স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় মানসিক স্বাস্থ্য ব্যাধি ও পরিচর্যাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। 

meghna

আরও পড়ুন


meghna